ব্যবসা নিয়ে জল্পনা কল্পনা নয়, সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করুন

জাহাঙ্গীর আলম শোভন // না পরিবার পরিকল্পনার কথা নয়, দেশের পাঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাও নয়। যে পরিকল্পনায় পরীরা উড়ে যায় আর কল্পনা পড়ে থাকে সেটাও নয়। বলছি নতুন উদ্যোক্তাদের কথা। যারা পরির আগেই কল্পনা করেন। প্লান ছাড়াই ব্যবসায় শুরু করেন শেষে বলেন ‘‘মন্দ কি অভিজ্ঞতা তো হলো।’’ এটা নাকি বাঙালীর স্ট্র্যাটিজি, ভুল করে বলে ‘‘অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি’’। তা বাবা সাইন্স অব স্টুপিডের মতো পড়ে কোমর ভেঙ্গে গেলে গাছে উঠার অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেট দিয়ে তখন কি হবে?

এজন্য আমিও বলি যা করার তার লক্ষ্য ঠিক করে একটু প্লান করে করলে কি হয়? হোকনা সেটা সাধারণ কোনো কিছু অথবা বৃহৎ কোনো কাজ। জ্ঞানীরা বলেন প্রতিটি মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়ো। মানে হলো যে যত বড়ো স্বপ্ন দেখে সেটা করার যোগ্যতা তার আছে। কিন্তু সারাবিশ্বে এক কোটি লোক যদি স্বপ্ন দেখে সবাই কি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হবে? হবেনা। হবে কেবল বারাক ওবামার মতো লোকেরা যারা স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি সে স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য কাজ করেছে এবং ধাপে ধাপে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে গেছে।

এক : মূল বিষয়গুলো লিখে নিন
প্রথম কাজটা হলো একটা সাদাকালো ব্যাপার। মানে সাদা কাগজে কিছু লেখা। আমরা অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিছুই ভুলে যাই। একটু লেখাজোখা থাকলে আর মিসিং হওয়ার ভয় থাকেনা। তাহলে কি লিখতে হবে?

১.এই ধরুন কি ব্যবসায় করতে চান? পণ্য না সেবা? সেটা শতকরা কতজন লোক বছরে কতদিন ব্যবহার করে। যে এরিয়া নিয়ে ব্যবসায় তার আয়তন, জনসংখ্যা, ব্যাংকিং, ডেলিভারি ও যাতায়াত সুবিধা।
২. তারপর ব্যবসা করতে প্রাথমিক কি কি জিনিস লাগবে ? তার জন্য কি পরিমাণ খরচ সময় ও লোকবল লাগবে? ইত্যাদি?
৩. পণ্যটা কখন কিভাবে পাওয়া যায়? কোথায় কেমন দাম? পরিবহন পদ্ধতি কি? এর মেয়াদ? প্যাকিং পচনশীলতা ইত্যাদি।
৪. ঠিক এই সময়ে পণ্যটি মানুষের জন্য কতটা ব্যবহার করা জরুরী বা এর বিকল্প আর কোনো পণ্য আছে কিনা? আর সেটা কারা প্রোভাইড করে।
৫. এই পণ্যটির বা সেবাটির জন্য কাজ করতে আপনি কতটা উপযুক্ত বা এ বিষয়ে আপনার ধারণা কেমন?
কোনো একটা বিষয়ে লেখার আবার আপনার মত বদলে যায় তবুও লিখুন। ব্যবসায় শুরু আগে মত বদলানো ব্যবসায় শুরুর পরে মত বদলানোর চেয়ে ভালো নয় কি?

দুই: লক্ষ্যটাকে কয়েকটি ধাপে সাজিয়ে নিন
বড় কোনো লক্ষ একদিনে অর্জন হয়না। এটা সোজাসাপ্টা কথা। লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে উঠতে হয় পাহাড়ের চ’ড়ায় আর চলার পথে সামান্যা পা ফসকে পড়ে গেলে মিশন ফেইল। এজন্য পুরো যাত্রাকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে নিতে হয়। ধাপে ধাপে বেইসক্যাম্প থাকে। বিশ্রাম থাকে। প্রতি পর্বের অভিজ্ঞতা পরের পর্বে কাজে লাগানো হয়। প্রতিটি ধাপে সফলতা ব্যর্থতা বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনে নতুন করে ছক সাজাতে হয়। জীবনের প্রতিটি বিষয়ই এইরকম।

মনে করি আপনি একটি ই শপ চালু করলেন আপনার লক্ষ্য বাংলাদেশের সেরা দশের মধ্যে থাকা। এখন এই কাজ কিন্তু একদিনে সম্ভব নয়। আপনার আর্থিক ও অন্যান্য সামর্থ্যের উপর ভিত্তি করে আপনি ২/৩ বছরের একটি পরিকল্পনার ছক কষবেন। আজ থেকে ২৪ মাস পরে আপনি যদি ৫ নাম্বারে থাকতে চান। আপনি ধারনা করুন। ১২ মাস পরে কোথায় থাকতে হবে? ৬ মাস পরে কোন পর্যায়ে থাকবেন আর ৩ মাসে আপনার অর্জন কি হবে? ঠিক এভাবে প্রতি ত্রৈমাসিক প্লান এন্ড গোল সেট করুন। সেটাকে আবার রুটিনের মধ্যে নিয়ে আসেন প্রথম দ্বিতীয় ও তৃতীয় মাসে আপনার করনীয় কি কি আছে?

এভাবে প্রথম ৩ মাসকে বিচার করেন?
১. যা করতে চেয়েছেন তা করতে পেরেছেন কিনা? যদি না পারেন তাহলে কি সমস্যা ছিলো? এর তার সমাধান কি?
২. যেসব উদ্যোগ নিয়েছেন সেগুলোর যে পরিমাণ সাড়া পাওয়ার কথা তা পেয়েছেন কিনা? না পেলে কেন পান নাই/? এই অবস্থায় পরবর্তী পদক্ষেপ কি হবে?
৩. এভাবে প্রতিটি ধাপে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করুন? ব্যর্থ হলেও আপনি ব্যর্থতার সঠিক কারণটা জানতে পারবেন। আবার যখন শুরু করবেন তখন সেটা মনে থাকবে?

তিন: বাজারটা বুঝে দেখুন
ব্যাপারটা বিদেশীরা খুব ভালোভাবে করে, আমরা যখন শুনি তখন কেবল প্রশংসা করি কিন্তু আমরা সেভাবে করার কথা ভাবিনা। অবাস্তব কল্পনা করে নিজের উপর বেশী আত্মবিশ্বাস রেখে শুরু করে দেই। এমনটা ঠিক নয়, আমি আপনি যা ভাবছি কনঝুমার হয়তো তা ভাবছেনা। এজন্য বাজারের উপর একটু স্টাডি করে ব্যবসায় নামা দরকার।

প্রথমত: বাজার ও ব্যবসায় সম্পর্কে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করুন।
দ্বিতীয়ত: নেটে সার্চ দিয়ে সর্বশেষ পরিস্থিতি জেনে নিন।
তৃতীয়ত: যারা এর আগে এই কাজ করেছে তাদের অভিজ্ঞতা জেনে নিন।
চতুর্থত: যেকোনো ধরনের অনলাইন বা অফ লাইনের একটি জরিপ করার চেষ্টা করুন? জরিপ করার সময় সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করন। এ ব্যাপারে একটা কৌতুক আছে। রাশিয়াতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী প্রশ্ন করা হয়েছে ‘‘ আপনি কি ইন্টারনেট ব্যবহার করেন’’? সবাই উত্তরে ‘‘হ্যাঁ ’’ বলেছে। জরিপের ফলাফল ‘‘ রাশিয়ায় ১০০ ভাগ ইন্টারনেট ব্যবহার করে।!!!!!!!
পঞ্চমত: বাজারের উপর নজর রাখুন, আপনার ধারণাগুলো নোট করুন, পরে এগুলো মিলিয়ে নিজেকে নাম্বার দিন, বুঝতে চেষ্টা করুন আপনি কি বাজারকে বুঝতে পারছেন???।

চার: কিছু সিদ্ধান্ত হবে সুনির্দিষ্ট
কিছু কিছু ব্যাপারে আপনাকে কনফিউশন রেখে যাবেনা। আপনি পরে বাস্তবতার কারণে সিদ্ধান্ত পরিবর্তণ করতেই পারেন কিন্তু আগে আপনাকে রাস্তা ঠিক করে এগুতে হবে। যেমন
১. আপনার পণ্য কি হবে? কাদের জন্য হবে? কোন পক্রিয়ায় ব্যবসায় করবেন?
২. লাভ লোকসান পলিসি কি হবে? কোয়ালিটি সূত্র কি?
৩. মার্কেটিং, ডেলিভারি ও এডমিন কারা হবে, কিভাবে এটা সাজানো হবে।
৪. সম্ভাব্য সাড়া কেমন হতে পারে? লোকসানের সম্ভাবনা কতটুকু? সেটার জন্য আপনি কতটা প্রস্তুত

পাঁচ: পরিকল্পনা হবে লিখিত, ধাপে ধাপে থাকবে প্রতিবেদন ও মূল্যায়ন
প্রতিটি কাজের কথা লিখে রাখুন- ডায়রী নোটবুক বা পিসিতে। একটা ছক রাখুন যেখানে কাজের ফলাফল ও কারণ লেখা যায়। এগুলো পরে কাজে দিতে পারে। সহকর্মীদের নিয়ে আলোচনা করে সমস্যা বের করে এ র সমাধান বের করতে হবে।

এভাবে একটি পরিকল্পনা আপনাকে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। এবং ধাপে ধাপে লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করবে আর কোনা কারণে কোথায় ভুল ত্রুটি ধরা পড়লে ঠিক করা যাবে এমন কি মুল আইডিয়াটা সময় বা স্থান উপযোগী না হলে প্রথমপর্যায় থেকে সরে আসা যাবে। কিন্তু অনেক কিছু একসাথে করতে চাইলে এমন সুবিধা নাও হতে পারে। বিশেষ করে ইনভেস্টমেন্ট যদি পরিকল্পনাহীন হয় তাহলে ঝুঁকিটা একটু বেড়ে যায়।

সবচে বড়ো কথা যেকোন কাজ শুরু করার আগে সেকাজ সম্পর্কে না জানলে তাতে ভালো পরিকল্পনা করা যায়না। তাতে শুধু জল্পনা কল্পনা করা যায়।

SHARE
Jahangir Alam Shovon
২০০৫ থেকে ই-কমার্স এর উপর বিভিন্ন ধরনের কাজের সাথে যুক্ত আছি ও স্টাডি করছি। এই বিষয়ে বাংলা ভাষায় অনলাইনে আমার বহু লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও আমি লোকসাহিত্য, সাংবাদিকতা, ইসলাম, চলচ্চিত্র এসব বিষয়ে লিখি। বর্তমানে একটি বিদেশী চ্যারিটি সংস্থায় কর্মরত আছি।

মন্তব্য পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here