ফেসবুক বন্ধ কিন্তু ই-কমার্স কি বন্ধ থাকবে?

Facebook marketing alternatives

জাহাঙ্গীর আলম শোভন //  হ্যাঁ বলছিলাম ফেসবুকের কথা, দীর্ঘদিন ফেসবুক বন্ধ থাকার কারণে ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত উঠেছে। যারা ফেইসবুক ভিত্তিক মার্কেটিং নির্ভর ছিলেন তাদের ৯৮ ভাগ অর্ডার কমে গেছে। যারা অনলাইন ভিত্তিক ছিলেন তাদের ৮০ ভাগ এবং সর্বোপরি ৭৫ ভাগ ব্যবসায় পড়ে গেছে এই বন্ধে। প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। এমনিতে এই ব্যবসায়িক খাতটা এখনো সোজা হয়ে দাড়াতে পারেনি। তারপর এই বিপদ। মনে হলো যে শিশুটি এখনো হাটতে বা দৌড়াতে শেখেনি, কিছু একটা ধরে একটুখানি দাড়াতে পারে মাত্র, সে শিশুটির কাছ থেকে তা কেড়ে নেয় হলো।

একটা মেসেজ আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে আমরা কখনো একটি মাধ্যমের উপর যিন নির্ভরশীল না হয়। ফেইসবুকের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতার কারণে এমনটা হয়েছে। যদি আমরা অন্যান্য মাধ্যমেে আমাদের প্রমোশনাল একটিভিটি এগিয়ে রাখতাম তহালে আজ ফেসবুক ব্ন্ধ করে দেয়ার ফলে অন্তত এতটা ক্ষতিগ্রস্থ হতাম না। আমাদের মনে রাখতে হবে ফেইসবক না থাকলে কি আমরা আমাদের ব্যবসায় করতাম না? তাছাড়া ফেসবুক এসেছে সেদিন আর আমাদের ই কমার্স কিন্তু তারচেয়ে পুরনো। সূতরাং আমরা এখন থেকে সতর্ক হই। আমাদের মার্কেটিং বিপনন প্রমোশন বা ব্রান্ডিং এর জন্য শুধুমাত্র ফেবসবুকের উপর নির্ভরশীল না থেকে বিভিন্ন মাধ্যমের ব্যবহার বাড়িয়ে দিই। তাহলে অন্তত ভবিষ্যতে কখনো ফেসবুক বন্ধ হলে এতটা ক্ষতির সম্মুখিন যেন হতে না হয়।

১. অন্যান্য সামাজিক মাধ্যম

এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে আপনি শুধুমাত্র ফেসবুকের উপর নির্ভরশীল না থেকে, টুইটার, ইউটিউব, পিন্টারেস্ট, লিংকডইন, গুগল প্লাস এবং আগামী দিনের সম্ভাব্য জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যমগুলোতে পেইজ খুলে রাখুন, লাইক, বন্ধু, ফলোয়ার বাড়ান, প্রতিদিন বা দুই একদিন পর পোস্ট দিতে থাকুন, কোনো সাড়া না পেলেও করতে থাকুন, ভবিষ্যতে বিপদের সময় কাজে লাগবে। তবে এসবের লিংক সাইটে দিতে ভুলবেন না এবং পেইজে সাইটের লিংক অবশ্যই দেবেন।

২. বিকল্প এডমিন ও বিকল্প পেজ

এমন হতে পারে আপনার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজটি কোনো কারণে হ্যাক হয়েছে বা ব্লক রয়েছে তখন যদি আপনি আপনার বিজনেস পেজে পোষ্ট দিতে না পারেন তখন কি হবে? সেজন্য আপনাকে বিকল্প এডমিন রাখতে হবে, সেটা হতে পারে আপনার কোনো সহযোগী অথবা আপনার নিজেরই আরেকটি আইডি। আবার বিজনেস পেজও দুটি থাকতে পারে একটি শপ অন্যটি বিষয় ভিত্তিক তথ্যপাতা। যেমন ধরুন আপনি চামড়ার ব্যাগ ও জুতার ব্যবসায় করেন, এক্ষেত্রে আপনার মূল পেজ আপনার শপের নামে ‘‘পাদুকা.কম’’, পাশাপাশি ‘‘বাংলালেদার’’ নামে বাংলাদেশের চামড়াজাত দ্রব্যের তথ্য ও ছবি দিয়ে আপনি অন্যএকটা পেজ রাখতে পারেন।

৩. ক্লাসিফাইড এড সাইটে কানেকটেড থাকুন

আমাদের দেশে বিক্রয় ডট কম, এখানেই ডটকম, খানস লিস্ট, এছাড়া রয়েছে আরো কয়েকটি ক্লাসিফাইড এড সাইট। এগুলোতে আপনি নিয়মিত আপনার বিভিন্ন পন্যের ছবিসগ এড পোষ্ট করতে পারেন। মনে রাখবেন এসব সাইটে যারা ভিজিট করে তারা প্রকৃত কাষ্টমার, তারা শুধুমাত্র দর্শক নয়। আপনার একটি পোষ্ট পেসবুকে একশজনের চোখে পড়লে যদি একজনের কেনার সম্ভাবনা থাকে তবে ক্লাসিফাইড এড সাইটে এই সম্ভাবনা ৭ থেকে ৯ জন হবে প্রতি ১০০ জনে। তাই এসব সাইটে এড পোষ্ট করে ভিজিটর এবং কাস্টমার আনুন। আপনার পেজ ও ওয়েবলিংক শেয়ার করতে ভুলবেন না।

1. bangladeshclassifieds.com
2. craigslist.org
3. classifiedsbangladesh.com
4. bangladeshclassified.net
5. khanslist.com.bd
6. postad.com.bd
7. clickdhaka.com
8. 4jat.com
9. groono.com
10. domesticsale.com
11..locanto.com.bd/
12.clickdhaka.com/

৪. আপনার ওয়েব সাইট রিচ করুন

জেনে রাখুন যে, আপনার সাইট হচ্ছে আপনার দোকান, অন্যান্য মার্কেটপ্লেস আপনার জন্য একটা বাজার, সামাজিক মাধ্যম আপনার জন্য একটা মেলা বা ফেয়ার। এজন্য সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণার পাশাপাশি আপনার সাইটকে রিচ করুন। সাইটের এই রিচ অবশ্য অন্তত ৫ ভাবে করুন।
১. আপনার সাইটের ফিচার এবং ডিজাইন ফ্রেন্ডলী এবং সহজ হওয়া চাই।
২. আপনার সাইটে পর্যাপ্ত কনটেন্ট থাকা চাই, প্রতিটি পন্যের পর্যাপ্ত তথ্য থাকতে হবে।
৩. সাইটের এসইও ও ট্রাফিক ভালো থাকতে হবে এ্যালেক্সা র‌্যাংকিং এ ভালো অবস্থান রাখতে হবে।
৪. নিয়মিত ভালো ভিজিটর আনার কথা ভাবুন এবং সে ধারা বজায় রাখার ব্যবস্থা করুন।
৫. বিভিন্ন সাইটের লিংক আপনার সাইটে শেয়ার করুন আপনার সাইটের লিংক বিভিন্ন সাইটে দেয়ার চেষ্টা করুন।

৫. লিংক বিস্তৃত করুন

আপনার সাইটের মিডিয়া লিংক যত বিস্তৃত হবে তত প্রচার প্রসার বেশী হবে। এজন্য আপনাকে কতগুলো কাজ করতে হবে।
১. বিভিন্ন পেজে আপনার পোষ্ট দিতে পারেন।
২. নিজের ব্লগ এর পাশাপাশি অন্যব্লগে সেবা, পন্য ও রিলেটেড পোষ্ট দিন এবং সেখানে সাইট ও পেজের লিংক শেয়ার করুন।
৩. পত্রিকা ও অনলাইন নিউজ হাউজগুলোতে, প্রেসরিলিজ, প্রোডাক্টস রিভিউ ও ফিচার লিখে পাঠান।
এরকম যদি ২০টা পেজে আপনার পোষ্ট থাকে। ২০ পত্রিকায় প্রেস রিলিজ ছাপা হয়, ২০টা ব্লগে লেখা থাকে। নিজের ব্লগে ২০টা আর্টিকেল থাকে, অন্য ২০টা সাইটে লিংক দেয়া থাকে এই ১০০টি সূত্র হতে আপনি প্রতিনি কিছুনা কিছু ভিজিটর পাবেন বলে আশা করা যায়।

৬. অন্যান্য অনলাইন মার্কেটিং

ইত্যবসরে অন্যন্য অনলাইন মার্কেটিং এর জগত থেকে হেঁটে আসতে পারেন। বিভিন্ন অনলাইন সাইটে এড দিতে পারেন, অন্যকোনো পক্ষের সাহায্য নিয়েও অনলাইন মার্কেটিং এর আরো বিভিন্ন সুযোগ নিতে পারেন। এফিলিয়েটেড মার্কেটিং, পত্রিকার সাইটে এড ইত্যাদি।

৭. এড বিনিময়

মনে করুন আপনি জামদানী শাড়ি বিক্রি করেন, আপনার আরেক বন্ধু করে বিক্রি করে ইলিশ মাছ। এক্ষেত্রে আপনারা বিজ্ঞাপন বিনিময় করতে পারেন। মানে আপনার সাইটে তার এড তার সাইটে আপনার এড দিতে পারেন। এতে দুজনেরই উপকার হবে।

৮. সামাজিক বিজ্ঞাপন

অফলাইনের মতো অনলাইনেও সামাজিক এড দিতে পারেন। যেমন ধরুন আপনি ডায়বেটিস সামগ্রী বিক্রি করেন, এখন কি করলে ডায়বেটিস হওয়ার চান্স কমবে সে মেসেজ দিয় এড দেবেন। একপাশে কোম্পানী নাম লোগো থাকবে। এবং এটা বিভিন্ন দিবস ও অকেশনে করতে পারেন। যেমন ডায়বেটিস ডে।

৯. মেম্বারশীপ এবং ডাটা ব্যাংক

আগেই কাস্টমার, রেগুলার কাস্টমার ও সম্ভাব্য কাস্টমারদের মেইল ফোনসহ ডাটা সংগ্রহ করে রাখুন। যাতে ইমেইল, এসএমএস যেকোনো ধরনের মার্কেটিং চালানো যায়। বিশেষ ছাড় দিয়ে মেম্বারশীপ দেয়া একটা ভালো পদ্ধতি।

১০. বিবিধ

অনলাইন ও অফলাইন এর মাঝামাঝি আরো কিছু মাধ্যম ব্যবহার করে আপনি ব্রান্ডিং, মার্কেটিং এমনকি কাস্টমার ইনভলবমেন্ট এর মাধ্যমে সেল বাড়াতে পারেন।

১. আপনি টিভিতে বড় এড না হোক স্ক্রল এড দিতে পারেন। ছোট ছোট ভিডিও এড বানিয়ে ইউটিউবে দিতে পারেন।
২. মজার মজার ফানি ভিডিও বানাতে পারেন যেগুলো আপনার ব্যবসায়কে প্রমোট করতে পারে। প্রতি দুই/তিন মাসে একটা বানাতে পারেন।
৩. রেডিওতো পরীক্ষামূলক এড দিতে পারেন। সরাসরি এড দেয়া যদি ব্যয়বহুল হয় তাহলে গিফট এড দিতে পারেন। যেমন রেডিওতো যারা এসএমএস করে তাদেরকে রেডিওর মাধ্যমে গিফট দিতে পারেন এই শর্তে যে গিফটের বিনিময়ে অনুষ্ঠানে আপনার নাম ও পন্য সম্পর্কে কিছু বলে দেয়া হবে।
৪. স্বাভাবিক অবস্থায় খুব না দিলেও সামাজিক মাধ্যম বন্ধ হয়ে গেলে তখন ইমেইল মার্কেটিং করতে পারেন।
৫. করতে পারেন এসএমএস এবং টেলিমার্কেটিং।
৬. যেহেতু কাস্টমাররা ফেসবুকে পন্য দেখতে পারছেনা সেহেতু তাদেরকে কলের মাধ্যমে যুক্ত করা যেতে পারে।
৭. পুরনো কাস্টমারকে ফোন দিয়েও দেখা যায়।

শুধুমাত্র ফেসবুক মার্কেটিং করেই বসে থাকবেন না। অন্যগুলোও একটু একটু এপ্লাই করুন। সেগুলোতে খুব বেশী সাড়া পাওয়া না গেলেও একটু আধটু করে আপডেট করতে থাকুন। কোনো একদিন কাজে লাগবে। আজ থেকে ৫/৭ বছর আগে যারা ফেইসবুক পেজ খুলেছে তারা নিশ্চয় তখন সেখান থেকে তেমন কিছু পায়নি, কিন্তু আজতো অনেকে তারা ফেসবুক পেজ দিয়েই ব্যবসায় টিকে আছেন। তাহলে আমার ধারণা আজ যে মাধ্যমটি খুব বেশী লোক ব্যবহার করেনা ২ বছর পর তো সেটা বদলে যেতে পারে। তাছাড়া ফেসবুকে নানা ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, কোনো কারিগরি সমস্যাও দেখা দিতে পারে, এজন্য আমাদের অবশ্যই উচিত নয় শুধু ফেসবুকের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকা। নিশ্চয় এটা আর বোঝানোর প্রয়োজন নেই। তাহলে আমরা আর কি কি করতে পারি?

সর্বশেষ ওয়ারেন বাপেটের ভাষায় বলি, সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখবেন না, নিজের দুই পা পানিতে ডুবিয়ে নদীর গভীরতা মাপবেন না। কখনো একটা পন্য, একটা পদ্ধতি, একজন ব্যক্তি, একটা মাধ্যম, একটা আইডিয়ার উপর ভর করে বসে থাকবেন না।

2 টি মন্তব্য

মন্তব্য পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here