বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং

সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের ধারায় আজ আমরা অবস্থান করছি আধুনিক সভ্যতায়। পৃথিবীকে আমরা এখন চিনি উন্নত বিশ্ব নামে। আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করার ফলে মানুষের জীবন এখন উন্নত। শিক্ষা অগ্রগতি এবং বিজ্ঞানের নতুন নতুন উদ্ভাবনের ফলে আমরা এখন হাতের মুঠোয় সারা পৃথিবী তালুবন্দি করছি। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে আমাদের বাংলাদেশও। বর্তমান সরকার জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি চেষ্টা করছে আমাদেরকে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পূর্ণ জীবন যাপনের নিশ্চয়তা দিতে। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে রূপকল্প ২০২১ প্রণয়ন করেছে। রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের পথে বাংলাদেশে যে কয়কটি কার্যক্রম ব্যাপক ভাবে সারা ফেলেছে তার মধ্যে অন্যতম হল মোবাইল ব্যাংকিং। এটি বাংলাদেশে একটি যুগান্তকারী ব্যবস্থা এবং যার কারণে আমাদের আর্থিক কার্যক্রম অনেক বেশি সচলায়তন হয়েছে।

তাই আজ আপনাদের জন্য লিখছি বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং নিয়ে। মোবাইল ব্যাংকিং কি, এর সেবা, এটা কিভাবে কাজ করে এবং তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত মোবাইল ব্যাংকিং নিয়ে জরিপ সহ আজকের লেখাটি আরও নানা ধরণের তথ্য দিয়ে সাজানো হয়েছে। নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো –

মোবাইল ব্যাংকিং কি ?

মোবাইল ব্যাংকিং এম-ব্যাংকিং এবং এসএমএস ব্যাংকিং নামেও পরিচিত। এ ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় অনেক ব্যাংকিং সেবা মোবাইল ফোনে দেওয়া হয়। এ জন্য গ্রাহককে কোন ব্যাংকে যেতে হয় না। ১৯৯৯ সালে ইউরোপের ব্যাংকগুলো প্রথম এ ধরণের সেবা চালু করে। বাংলাদেশে প্রথম ৪টি ব্যাংক এ সেবা নিয়ে আসে। ব্যাংকগুলো হল – ১) ব্র্যাক ব্যাংক ( বিকাশ ), ২) ডাচ বাংলা ব্যাংক, ৩) ট্রাস্ট ব্যাংক, ৪) মারকেন্টাইল ব্যাংক। এছাড়াও আরো ৮টি ব্যাংক একই সেবা চালুর ব্যবস্থা করছে। ৬ টি মোবাইল কোম্পানি টেলিটক, সিটিসেল, গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি ও এয়ারটেল এই ব্যাংকিং সেবায় সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন ( এটুআই ) পোগ্রাম ইউনিয়ন তথ্য সেবাকেন্দ্রে মোবাইল ব্যাংকিং চালু করার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। শুরুর কয়েক বছরের মধ্যেই ২০১২ সাল নাগাদ ৫টি ব্যাংকের সহযোগিতায় ২হাজার ৫শ ৬৫টি ইউনিয়ন তথ্য সেবাকেন্দ্রে মোবাইল ব্যাংকিং চালু করা হয়েছে যা বর্তমানে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৩ সালের জুন মাস পর্যন্ত দেশের মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ১০ কোটির মতো যা বর্তমানে ১২কোটি ছাড়িয়েছে এবং প্রতিদিনই এ সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই এ অবস্থায় মোবাইল ব্যাংকিং সহজেই দেশের অনেক মানুষ (যারা প্রচলিত ব্যাংকিং সেবা নিতে পারছে না ) তাদের প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেনের আওতায় নিয়ে আসছে।

মোবাইল ব্যাংকিং এর সেবাগুলো কি ?

মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সব ধরণের জরুরি সেবাই পাওয়া যায়। এসবের মধ্যে রয়েছে –

১) টাকা জমা
২) টাকা তোলা ও পাঠানো
৩) বিভিন্ন ধরণের বিল প্রদান ( বিদ্যুৎ বিল,গ্যাস বিল,পানি বিল )
৪) কেনাকাটা করা
৫) বেতন ভাতা প্রদান ও গ্রহণ
৬) মোবাইল ফোন টপ আপ ইত্যাদি ।

এখন এসব সেবার জন্য ব্যাংকে যাওয়ার দরকার হয়না। মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর সার্ভিস সেন্টার বা এজেন্ট এবং ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্রেই উপরোক্ত সকল সেবা পাওয়া যায়।

প্রবাসী বাংলাদেশী বা যে কেউ বিদেশ থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠাতে পারেন।

এ ব্যবস্থা কিভাবে কাজ করে ?

মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা এতটাই সহজ যার কারণে যে কেউ এর সেবা গ্রহণ করতে পারেন। এ জন্য পড়ালেখা না জানলেও চলে।টাকা-পয়সাও অনেক থাকার দরকার নেই। দেশের সব প্রান্তেই এ সেবা পাওয়া সম্ভব।

এ সেবা নেওয়ার জন্য অনুমোদিত এজেন্ট বা ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্রে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করাতে হবে। এজন্য পূরণ করতে হবে KYC ( Know Your Client ) ফরম যা একটি ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপিসহ জমা দিতে হবে।

এজেন্ট সকল প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর তার মোবাইল ফোনের রেজিস্ট্রেশন মেন্যুতে গিয়ে কাস্টমারের মোবাইল নম্বর ঢুকান। তারপর কাস্টমার তার পিন নম্বর পছন্দ করার জন্য একটি বার্তা পান। পিন নম্বর দেওয়ার পরই তার মোবাইল একাউন্ট খোলা হয়ে যায় যে একাউন্ট আসলে তার ফোনেরই নম্বর প্লাস একটি চেক ডিজিট।

রেজিস্ট্রেশনের জন্য কোন ফি দিতে হয়না শুধু একাউন্ট খোলার জন্য কমপক্ষে ১০ টাকা জমা দিতে হয়। একাউন্ট খোলার সঙ্গে সঙ্গে টাকা জমা দেওয়া যায় তবে টাকা তোলার জন্য একাউন্ট খোলার সময় থেকে ১দিন অপেক্ষা করতে হয়। এই একদিনে ব্যাংকের কর্মকর্তারা কাগজপত্রগুলো চেক করেন। এ পরীক্ষা শেষ হলেই গ্রাহক আরেকটি বার্তা পান এবং তারপর থেকে সকল লেনদেনই করা যায়।

যাদের মোবাইল ফোন নেই তারাও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পেতে পারেন। এক্ষেত্রে যিনি টাকা পাঠান তাকে রেজিস্টার্ড হতে হয়। এজেন্ট রেজিস্টার্ড হওয়া গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাকে একটি ভাউচার নম্বর ও পাসওয়ার্ড দেন। প্রেরক তখন সেই নম্বর ও পাসওয়ার্ড যিনি টাকা পাবেন তাকে জানান। তারপর গ্রহীতা ফটো আইডি নিয়ে এজেন্টের কাছ থেকে টাকা তুলতে পারেন।

ইউআইএসসিতে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা

ইউআইএসসি ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের অন্যতম রূপকল্প হিসেবে দেশের সকল ইউনিয়ন পরিষদে ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্র (ইউআইএসসি ) স্থাপন বাংলাদেশ সরকারের একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। বর্তমানে বাংলাদেশে ৪ হাজার ৫শ ৪৫টি ইউনিয়নের মধ্যে সবকয়টিতেই আধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্র রয়েছে। মাত্র ৩-৪ বছর ধরে শুরু হওয়া ইউআইএসসির মোবাইল ব্যাংকিং ( এম ব্যাংকিং ) গ্রামের মানুষের কাছে এখন বেশ জনপ্রিয়। ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা গ্রামের অনেক মানুষ এখন অর্থ লেনদেনে এম ব্যাংকিংয়ের শরণাপন্ন হচ্ছে। মানুষের আগ্রহের কারণে দেশের সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যাংকগুলো গ্রামে এম ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য ব্যাংকগুলোর কাছে ইউআইএসসি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রথম দিকে ব্র্যাক ব্যাংকের বিকাশ, ডাচ বাংলা ব্যাংক, মারকেন্টাইল ব্যাংক এবং ট্রাস্ট ব্যাংক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এটুআই প্রোগ্রাম এবং স্থানীয় সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে দেশের ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য ও সেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে এম ব্যাংকিং সেবা চালু করে। পরবর্তীকালে আরও ব্যাংক ইউআইএসসিতে এম ব্যাংকিং সেবা চালু করার আগ্রহ প্রকাশ করে। সরকারও সকল ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য ও সেবাকেন্দ্রেই অন্যান্য সেবার সঙ্গে এই সেবাটি চালু করতে ব্যাপক সহযোগিতা করছে।

বিকাশের গ্রামবাংলায় চালু হওয়া এম ব্যাংকিং সম্বন্ধে যে তথ্য পাওয়া যায় তা বেশ উৎসাহ জনক। বর্তমান বিকাশ গ্রাহক সংখ্যা ১ কোটিরও বেশি এবং সারাদেশে কয়েক লাখ এজেন্ট রয়েছে যারা এম ব্যাংকিং জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। এ সকল এজেন্টদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য এজেন্ট হলেন ইউআইএসসির উদ্যোক্তারা। বিকাশ গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন এম ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন করছে।

ডাচ বাংলা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাসেম জানান – গ্রামের মানুষ সবচেয়ে সুবিধা ভোগ করছে বাড়ির কাছের ইউআইএসসি থেকে টাকা উত্তোলন করতে পেরে। এখন আর গ্রাহকদের কষ্ট করে যাতায়াত ভাড়া দিয়ে উপজেলা বা শহরে গিয়ে টাকা পেতে হচ্ছেনা। এম ব্যাংকিংয়ের জন্য সারাদেশে কয়েক লাখ সেবাগ্রহীতা রয়েছে এবং প্রতিমাসেই তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইউআইএসসির মাধ্যমে ডাচ বাংলা ব্যাংকের এম ব্যাংকিং সেবা নিচ্ছে গ্রামের প্রায় ৪ লক্ষাধিক মানুষ। এজন্য ব্যাংকটি একজন সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে টাকা জমাদানের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ এবং টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে ২ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জ নিয়ে থাকে। সার্ভিস চার্জের একটি অংশ ইউআইএসসির উদ্যোক্তা-এজেন্টকে দিতে হয়।

ডাচ বাংলা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাসেম আরও জানান – ইউআইএসসির মাধ্যমে এম ব্যাংকিং সেবা গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছেন। অতীতে গ্রামের মানুষ কখনো চিন্তাও করতে পারেনি যে, গ্রামের সন্নিকটে ইউআইএসসি থেকে প্রিয়জনদের পাঠানো টাকা তোলা যাবে এবং ব্যাংকের মতোই টাকা জমা রাখা যাবে। কিন্তু এটা ইউআইএসসির মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে। ডাচ বাংলা ব্যাংক নিজস্ব উদ্যোগেও দেশের বিভিন্ন স্থানে এম ব্যাংক চালু করেছে। এর ফলে ব্যাংকটির সক্রিয় গ্রাহক সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সরকার সকল ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরণের সেবা দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে দেশের ২২টি ব্যাংককে এম ব্যাংকিং চালু করার অনুমতি দেয়। এর লক্ষ্য দেশে বর্তমানে যে প্রায় ১২ কোটিরও বেশি মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী রয়েছে তাদের প্রত্যেকটি পরিবারকে এম ব্যাংকিংয়ের আওতায় নিয়ে আসা। ভবিষ্যৎ এর জন্য সবাই সঞ্চয় করতে চায়, গ্রামের মানুষও এর ব্যতিক্রম নয়। স্বল্প আয় করা টানাটানির সংসারে তারাও সঞ্চয় করার চেষ্টা করেন। কিন্তু দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকায় অনেকের সঞ্চয়ের ইচ্ছা থাকলেও তা পূরণ করতে পারছেন না। সে কারণে সরকার দেশের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত এম ব্যাংকিং চালু করে দেশের সিংহভাগ মানুষকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় নিয়ে আস্তে চাইছে।

মানুষ সঞ্চয় অভ্যাস গড়ে তুলতে সহযোগিতা চাইছে। মানুষের ব্যাংকিং সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কীভাবে তারা সঞ্চয় গড়ে তুলতে পারে তা স্পষ্ট জানা যায় এক গবেষণায়। সর্বশেষ ২০১২ সালের জুনে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ সদস্য সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন ( আইএফসি ) বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের আমানতের গতি-প্রকৃতি” শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে শ্রমিকদের ব্যাংকিং সুবিধা দিতে ও সঞ্চয় সহযোগিতা করতে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে লেনদেনের পরামর্শ দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে – অধিকাংশ শ্রমিক নিজের বাসা বা অন্যকোন অপ্রাতিষ্ঠানিক স্থানে টাকা জমা রাখেন। এতে তাদের সঞ্চয় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাড়ায়। বেশিরভাগ শ্রমিক বেতন হিসেবে নগদ অর্থ গ্রহণ করেন এ কারণে ব্যয়ের উপর তাদের তুলনামূলক কম নিয়ন্ত্রণ থাকে। ফলে মাস শেষে শ্রমিকদের আর্থিক সংকটে পড়তে হয়। এজন্য প্রায়ই তাদের বন্ধুবান্ধব বা অন্য কোন মাধ্যম থেকে ঋণ নিতে হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ৮২ শতাংশ শ্রমিক মনে করেন তাদের সঞ্চয় করা প্রয়োজন। এর মধ্যে মাত্র ১৪ শতাংশ শ্রমিক নিজেদের ব্যাংক হিসাবে ও ৫ শতাংশ শ্রমিক বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয়স্বজনের কাছে উপার্জিত অর্থ সঞ্চয় করেন।

সেই হিসেবে আরও বাকি ৬৩ শতাংশ শ্রমিককে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা সম্ভব। আইএফসির ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত সাউথ এশিয়া এন্টারপ্রাইজ ডেভেলপমেন্ট ফ্যাসিলিটি ও বাংলাদেশ ক্লাইমেট ফান্ড স্টাডি এই প্রতিবেদন তৈরি করে। এতে সহযোগিতা করে যুক্তরাজ্যের ডিএফআইডি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও নরওয়েজিয়ান এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন। এতে ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের আর্থিক সেবা পাওয়ার প্রতিবন্ধকতাগুলো পর্যালোচনা করা হয়।

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সুবিধা আলোচনা ও তৃণমূলে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা নিয়ে জরিপ

এখনও দেশের প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদের বিশাল তৃণমূল জনগোষ্ঠী ব্যাংকিং সেবা থেকে বঞ্চিত। শহরাঞ্চলে কর্মরত কলকারখানার শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীর ব্যাংক হিসাব খোলার মতো সময় এবং টাকার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। উপরন্তু ব্যয় বিবেচনায় দেশের প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থা তৃণমূল ও স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীর অল্প টাকার লেনদেনে উৎসাহ প্রদান করেনা এবং গ্রামাঞ্চলে ব্যাংক শাখা পরিচালনা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য সবসময় লাভজনকও বিবেচিত হয়না।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগণের মাত্র ৩০ বা তার কিছু বেশিভাগ ব্যাংকিং সেবার আওতায় রয়েছে। অন্যদিকে মোট জনসংখ্যার ৭০ ভাগ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে থাকে। শহর-গ্রাম,উচ্চবিত্ত-নিম্নবিত্ত নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষই মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে। দেশে এমন সব অঞ্চল রয়েছে যেখানে অর্থনৈতিক বিবেচনাতে হয়তো কখনোই ব্যাংকের শাখা খোলা হবেনা। কিন্তু মোবাইল নেটওয়ার্ক সারাদেশের আনাচে-কানাচে বিস্তৃত। মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং তার ব্যবহারকারীদের এ ব্যাপক বিস্তৃতি আমাদের দেশে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকা বিশাল জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সেবার আওতায় আনা এবং তাদের কাছে ব্যয় সাশ্রয়ী ও নিরাপদ আর্থিক সেবা সহজলভ্য করার মজবুত ভিত তৈরি করে দিয়েছে।

দেশে মোবাইল ব্যাংকিং এখন বহুল আলোচিত। Alternative Payment Channels হিসেবে ব্যাংকিং খাঁতে মোবাইল প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংক ২৩টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে

মোবাইল প্রযুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন আর্থিক সেবা প্রদানের অনুমোদন প্রদান করেছে যার মধ্যে ১৪টি ব্যাংক তাদের কার্যক্রম চালু করেছে। এ ব্যাংকগুলো সারাদেশে ১৮,৫৮১টি এজেন্টের মাধ্যমে প্রায় ৮ লাখ গ্রাহককে মোবাইল প্রযুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন আর্থিক সেবা পৌঁছে দিচ্ছে।প্রতিমাসে প্রায় ২হাজার কোটি টাকা উপরে লেনদেন হচ্ছে।

বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব ও পার্বণে এ লেনদেনের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। রমজান মাসে লেনদেনের পরিমাণ অন্যান্য সময়ের চেয়ে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি থাকে। প্রতিমাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ১৫ শতাংশ করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের শাখাসমূহ বিভিন্ন সরকারি লেনদেন যেমন: শিক্ষকসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদান,ভর্তুকির অর্থ প্রদান,কর গ্রহণ,রেমিটেন্স বিষয়ক লেনদেন, ইউটিলিটি বিল গ্রহণ ইত্যাদি নিয়ে অত্যন্ত চাপের মধ্যে থাকে। এ চাপ থেকে গ্রাহকগণও মুক্ত নন। মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্প্রসারিত হলে এ ধরণের বিড়ম্বনা থেকে সকলে সহজেই নিষ্কৃতি পেতে পারে। বর্তমানে মোবাইলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ, পানি প্রভৃতির বিল পরিশোধ করা হচ্ছে। এ সেবা আরও সম্প্রসারিত হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যাংকের সামনে লাইনে দাড়িয়ে মানুষকে সময় নষ্ট করতে হবেনা।

পণ্য কেনাবেচার ক্ষেত্রে ক্রেডিট-ডেবিট কার্ডের মতোই মোবাইলের মাধ্যমে লেনদেন করা সম্ভব। বাটা,আড়ং এবং আরও বড় বড় রিটেইলার শপ ও কোম্পানিতে এখন মোবাইলের মাধ্যমে ক্রয় করা পণ্যের মূল্য পরিশোধ করা যাচ্ছে। বিশেষত কম ব্যয়ে ও নিরাপদে বৈধ পথে প্রিজনের কাছে রেমিটেন্স প্রেরণ করার বিষয়ে মোবাইল ব্যাংকিং এখন সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হিসেবে গ্রামাঞ্চলে অত্যন্ত জনপ্রিয়। বর্তমানে প্রতিমাসে ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রেমিটেন্স আসে যার অধিকাংশই প্রবাহিত হয় গ্রামাঞ্চলে। মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে দ্রুততার সঙ্গে রেমিটেন্সের অর্থ গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানো সম্ভবপর হচ্ছে।

দেশে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কতোগুলো সেক্টর রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হল – পোশাক শিল্প। যেখানে প্রায় ৪৫ লাখ শ্রমিক কর্মরত। তাছাড়াও রয়েছে অন্যান্য শিল্পখাতে কর্মরত বিপুল সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ। এ সকল শ্রমিকদের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ ভাগের কোন ব্যাংক হিসাব না থাকায় তারা সব ধরণের ব্যাংকিং সেবা থেকে বঞ্চিত। অথচ তাদেরও ব্যাংকিং সেবার প্রয়োজন হয়। বেতন তুলতে হয়,গ্রামাঞ্চলে বাবা-মা এবং ভাই-বোনদের কাছে টাকা পাঠাতে হয়। শ্রমজীবী এ বিপুল জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে দেশের প্রথাগত ব্যাংকিংয়ের চেয়ে মোবাইল ব্যাংকিং যে অধিকতর উপযোগী এটি ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে বাংলাদেশে আর্থিক সেবা গ্রহণ করতে পারে এরূপ গ্রাহকের সংখ্যা হতে পারে প্রায় ৪ কোটি মানুষ, কিন্তু বর্তমানে এর গ্রাহকের সংখ্যা এর ৪ ভাগের ১ ভাগ। সুতরাং এসব মানুষের কাছে মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম যত দ্রুততার সঙ্গে সম্প্রসারিত হবে সাধারণ মানুষের আর্থিক সেবা ততোই সহজলভ্য হবে।

বাণিজ্যিক ব্যাংক,মোবাইল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্রভিত্তিক এ ধরণের যৌথ উদ্যোগ বিপুল এ শ্রমজীবী জনসাধারণকে অনায়াসেই আর্থিক সেবার আওতায় নিয়ে আসতে পারে। যা সম্ভব হলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরও অগ্রগতির মুখ দেখবে।

বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা খুব গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। তাই আজকের লেখায় এ বিষয়ে বিস্তারিত বলার চেষ্টা করেছি। আশা করি আপনারা এখান থেকে অনেক কিছুই জানতে পারবেন। সামনে আরও গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয় নিয়ে লিখবো ইনশাআল্লাহ।

১ টি মন্তব্য

মন্তব্য পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here