Homeইকমার্স জ্ঞানব্যবসায় সাবধান, লাভের সাথে আছে লোকসান!

ব্যবসায় সাবধান, লাভের সাথে আছে লোকসান!

জাহাঙ্গীর আলম শোভন // বর্তমান বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান ই-কমার্স খাতে প্রতিদিন নতুন নতুন উদ্যোক্তা যুক্ত হচ্ছে। ব্যবসাটি কম পুঁজিতে করা যায় বিধায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা এতে উৎসাহিত হচ্ছে। কিন্তু ব্যবসা না বুঝে হঠাৎ করে শুরু করার কারণে অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আবার অনেকে টিকে থাকলেও উঠে দাড়াতে পারছেন না। কিন্তু কিছু লোক ঠিকই সফল হচ্ছেন ফলে এই সেক্টর দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে। আসুন ই-কমার্স ব্যবসায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা তাদের লোকসানের বিষয়টা কিভাবে মোকাবিলা করবেন এ বিষয়ে আমরা কয়েকটি বিষয় শেয়ার করি।

১. জেনে শুনে শুরু করুন
যেকোনো ব্যবসা জেনে শুনে শুরু করতে হয়। এ ব্যাপারে গাফিলতি করা এক ধরনের পাপ। আমাদের দেশে সাধারণত এ ধরনের প্রবণতা রয়েছে। আমরা ১০ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশ যাই ১০ হাজার টাকা খরচ করে কোনো কাজ শিখিনা। আমরা ২০ লাখ টাকা খরচ করে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান শুরু করি কিন্তু ২০ হাজার টাকা খরচ করে সে ব্যবসায়ের খুঁটিনাটি জানতে চাইনা। এজন্য এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার আপনি ব্যবসাটা বা পণ্যটা বা সেবাটা সম্পর্কে যত জানবেন তত অন্যের উপর নির্ভরশীলতা কমবে এবং আপনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। সাধারণত যারা বিভিন্ন ওয়ার্কশপে চাকরী করে তারা এ ব্যবসায়ে  সফল হয়। হোটেল ও টেইলারিং ব্যবসায়ের বেলায়ও প্রযোজ্য। এটা সত্যি হয়েছিলো গার্মেন্টস ব্যবসায়ের ক্ষেত্রেও এবং আপনি অবশ্যই কম ঝুকিযুক্ত পণ্য বা ব্যবসা বেচে নেবেন।

২. আপনার থাকবে ভালো পরিকল্পনা
একটি ভালো, সঠিক, সহজ, বাস্তবমুখী পরিকল্পনা একটা ব্যবসায়ের প্রাণ। তাই ব্যবসায়ের শুরুতে আপনি পরিকল্পনা করুন। আপনি কি করবেন? কেন করবেন? কিভাবে করবেন? এবং কাদের জন্য করবেন। এই প্রশ্নের জবাব খুঁজে আপনি প্রথম দফা উতরে যান। দ্বিতীয় দফায় আপনি দেখুন যে আপনার পণ্যের চাহিদা আছে কিনা? কত টাকা বিনিয়োগ করা যাবে? কত করে লাভ হতে পারে? পুঁজি উঠতে কতদিন সময় লাগতে পারে?  ইত্যাকার সব বিষয় ভেবে তবে পরিকল্পনা করুন,  ম্যানেজমেন্ট, মার্কেটিং ইত্যাদি কাজে কেমন খরচ হতে পারে। সেটা মোট খরচের কত শতাংশ এবং ইউনিট প্রাইসে কত পড়ে এতে করে আপনি  ক্ষতির সম্মুখীন হবেন কিনা? আগেই বোঝার চেষ্টা করুন। আপনার পরিকল্পনার অবশ্যই কয়েকটি ধাপ থাকবে। ধাপে ধাপে কাজ করবেন। সব টাকা একসাথে বিনিয়োগ না করে সেটাও পর্যায়ক্রমে করতে পারেন।

বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী ওয়ারেন বাফেট এর ২টি মূল্যবান উক্তি। তিনি তার কর্মীদের নিয়োগ দেয়ার সময় বলেন, সব সময় ২টি কথা মনে রাখবে।

প্রথম কথা: এমন কোন কাজ করবেন না, যাতে আপনার কোম্পানীর লোকসান হতে পারে।
দ্বিতীয় কথা: আর কোনো অবস্থায় প্রথম কথাটা  ভুলে যাবেন না।

৩. লোকসান পুঁজির অংশ
অনেকসময় নতুন ব্যবসায়ীরা বাজার দখল করার জন্য ইচ্ছাকৃত লোকসান দিয়ে থাকেন। কমদামে পণ্য বিক্রয় করে এটাকে মার্কেটিং খরচ হিসেবে ধরে থাকেন। ফলে লোকসানটা বিনিয়োগকৃত পূঁজির অংশ হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে আপনার অবশ্যই মনে রাখতে হবে সময়ের হিসেবে আপনি এই ভর্তুকি কতদিন চালাতে পারবেন? এবং টাকার মূল্যে আপনি এটা কত অংক পর্যন্ত বহন করতে পারবেন? এমনকি কত ইউনিট পণ্যের জন্য এটা প্রযোজ্য হবে?  লোকসানের সঠিক পরিকল্পনা থাকলে আপনি লোকসান থেকেও ফায়দা তুলতে পারেন। আর একজন প্রকৃত ব্যবসায়ী তিনি হবেন যিনি লোকসান থেকেও লাভবান হওয়ার রাস্তাটা জানেন।

Profit Risk Loss in ecommerce business৪. সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত
এটি ব্যবসায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ আপনি বাজার যাচাই করে দেখলেন, ১৬ জিবি পেনড্রাইভে ৪০ টাকা দাম কমিয়ে দিলে বিশাল একটা সাড়া আসতে পারে। কিন্তু আপনি সে সিদ্ধান্ত নিতে ২০ দিন চলে গিয়েছে এর মধ্যে বাজার ৩২ জিবির পেনড্রাইভ চলে এসেছে ১৬ জিবির চেয়ে মাত্র ১০০ বেশী টাকা দামে। এখন দেখা যাচ্ছে ১৬ জিবির দাম ১১০ টাকা কমালেও কাজ হবে কিনা সন্দেহ। আরেকটি বিষয় হলো, আপনি কখনো যদি সময় থাকতে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন তো সেটা ভুল হলে আপনি সংশোধন করতে পারবেন। কিন্তু দেখা গেল আপনি এমন সময় একটি সিদ্ধান্ত নিলেন সেটা আর পরিবর্তন করার সময় নেই, অথচ সিদ্ধান্তটি সঠিক হয়নি।

৫. লাভ লোকসানের হিসাব
আপনি আগেই হিসাব করে রাখবেন কত টাকা লাভ বা লোকসান হতে পারে। যদি ২০ হাজার টাকা লোকসান হয় তাহলে আপনার পলিসি কি হবে। আপনি কিভাবে ঘুরে দাঁড়াবেন বা ২০ হাজার টাকার মেকআপ পলিসি কি হবে। এসব আপনাকে আগেই ভেবে রাখতে হবে। একেবারে কাগজে কলমে হিসেব করে রেখে দিতে হবে। লোকসান এর ব্যাপারে একটা প্রস্তুতি থাকতে হবে যাতে করে সামান্য কতটাকা লোকসানের জন্য আপনার মেজাজ বিগড়ে না যায় আর আপনি খেই হারিয়ে না পেলেন।  ব্যবসায়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করার অভ্যাসটা গড়ে তুলতে হবে। আর প্রতিষ্ঠানে প্রতিটি লেনদেনে কথনও লাভ হয়না। লাভ হয় বছর শেষে। লাভটাকে সেভাবে হিসেব করুন। ব্যবসায়ের গতি থাকলে আপনি মাসিক লাভ লোকসানের একটা পর্যালোচনা করতে পারেন। লাভ লোকসানের বার্ষিক হিসাব এবং সেটা আর্থিক বছর ধরে করাটাই সর্বত্র চলে। এজন্য আপনাকে অনেক সময় বৃহৎ লাভের আশায় ক্ষুদ্র লাভ ছেড়ে দিতে হতে পারে।

৬. রিস্ক ফান্ড
ব্যবসায়িক ক্ষতি রিকভার করার জন্য আপনি রিস্ক ফান্ড রেখে দিতে পারেন। ধরি আপনি ১ লক্ষ টাকা নিয়ে ব্যবসায়ে নেমেছেন। এখানে আপনার উচিৎ হবে ২০/২৫ হাজার টাকা রিস্ক ফান্ড হিসেবে আলাদা রেখে দিতে পারেন। তাহলে বিপদের সময় আপনি সেই টাকা খরচ করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন। এটা অনেক উপকারে আসে। যেমন ধরুন আপনি অনেক পণ্য শপে তুলেছেন খুব ভালো চলছে না। এমুহূর্তে আপনি জানলেন যে একটা নতুন পন্য এসেছে এটা প্রথম প্রথম তুললে ভালো সাড়া আসবে। তখন আপনার সে ফান্ডকে আপনি কাজে লাগাতে পারবেন। সাময়িক লোকসানের হাত থেকে হয়তোবা বেচে যেতে পারেন।

৭. এভারেজ দাম এভারেজ লাভ
রিস্ক ফান্ডের মতো রিস্ক রেট পলিসিও আপনি নিতে পারেন। এতে করে সম্ভাব্য ক্ষতি বা লোকসানের ব্যাপারে আপনি আগেই সতর্ক হয়ে গেলেন। যেমন আপনি ১৪৪ টি মাইক্রোওভেন আনলেন। আপনি জানেন যে শতকরা ১০ভাগ ওভেন নষ্ট হয় বা নষ্ট থাকে। তখন আপনি যদি প্রতিটি ওভেন ৫০০০ টাকা করে কিনে থাকেন। তাহলে ১৪৪ টির দাম হবে ৭২০,০০০ টাকা। এখন আপনি মূল্য নির্ধারণ করুন ১৩০টি পণ্যের উপর। ৭২০,০০০কে ১৩০ দিয়ে ভাগ করে আপনি দেখনি প্রতিটিতে আপনার ক্রয়মূল্য কত পড়ে। তবে এক্ষেত্রে মার্কেট প্রাইসের সাথে সামঞ্জস্য রাখার বিষয়টিও ভুলে যাবেন না।

Business evaluation and achievements৮. মিতব্যয়িতা
ব্যবসায়ের লোকসান ঠেকাবার আদি এবং কার্যকর পদ্ধতি হলো মিতব্যয়িতা। আপনার ব্যবসা এবং লাভ কিন্তু একটা মার্জিনের বেশী কথনোই হবেনা। আপনার লাভ পুঁজি, পণ্য, বিক্রয়, দাম ইত্যাদির উপর নির্ভরশীল এবং সেটা একটা রেঞ্জ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। সুতরাং আপনি যদি হিসেবি হোন। খরচের হাতটা একটু সমঝে নিতে পারেন। আশা করা যায় আপনার লোকসানের ঝুঁকিটা কমে যাবে। এজন্য আপনি বাড়তি খরচ পরিহার করুন। পানি বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহারে মিতব্যয়ী হোন। যদি ফার্মে অনেক কর্মী থাকে তাদেরকেও এই অভ্যাসে নিয়ে আসুন। লাভ হওয়ার সন্দেহ আছে এরকম খাতে বিনিয়োগ করার আগে তিনবার ভাবুন।

৯. কাজও পরিশ্রম
আপনি নিজে কাজগুলো বুঝবেন পরিশ্রম করবেন, অন্যের উপর ভরসা না করে নিজে সময়মত কাজ করবেন বা কাজ আদায় করে নেবেন। এতে আপনার ব্যবসায়ের ক্ষতি কমে আসবে। আপনি যদি একজন কর্মচারী কম রাখতে পারেন। সেটা একটা লাভ। আপনি যদি নিজে কোন কাজ করতে পারেন সেটা একটা সুবিধা। একটা কথা আমি বলে থাকি যে আপনাকে হয়তো নিজ কাজটা করতে জানতে হবে অথবা কাউকে দিয়ে করাতে জানতে হবে। আর যদি দুটোর একটাও না পারেন। তাহলে আপনার ব্যবসা করার দরকার নাই। আপনি বরং অন্যের কাজ করেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রয়োজন সত্বেও আপনি কোনো লোক না নিয়ে নিজে নিজে সব করবেন।

“ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে একটি কথা প্রচলিত আছে – ব্যবসায় নাকি বিক্রি করার সময় লাভ করা যায়না, লাভ করতে হয় ক্রয় করার সময় “

১০. সময়ানুবর্তিতা
সময়ের ব্যাপারে কাজের সাথে সমন্বয় করতে হবে। কারণ আপনার মাস শেষে ঘরভাড়া, বেতন বিল কিছু খরচ দিতেই হবে তাই আপনার জন্য কাজ কম হয় বা বিক্রি বেশী না হয় তাহলে গড়পড়তা আপনার খরচ বেড়ে  যাবে। খরচ বেড়ে যাওয়া মানেই লাভ কমে যাওয়া এটা মাথায় রাখতে হবে। কারণ সময় হলো অর্থ। কেননা আপনি হয়তো ব্যাংক থেকে ১০ লক্ষ টাকা লোণ নিয়েছেন। এখন আপনাকে এজন্য বছরে ১২% সুদ দিতে হবে। আপনার খরচ মিলিয়ে বছরে আরো ৫ লাখ টাকা খরচ আছে । এখন আপনি একটি পণ্য কিনলেন লাভ করলেন ৫০ শতাংশ লাভ হবে। আপনি হয়তো লোণের ৫০% মানে ৫ লাখ টাকা দিয়েই পণ্য কিনতে পারলেন বাকী টাকা অফিস সেটআপ অন্যান্য কাজে খরচ হলো। আপনি খুশি হলেন যে আপনার ৫০% মানে ২ লাখ ৫০ হাজার লাভ হবে। কিন্তু দেখেন হিসেবটা ভুল। কারণ আপনার বছরে খরচ আছে ৫ লাখ। আর যদি আপনার পণ্য বেচতে ২ বছর লেগে যায় তাহলে তো একেবারে বুকে মাটি লেগে যাবে। হ্যাঁ আপনার ১০% লাভেও অনেক কিছু হতে পারে যদি আপনি টাকাটা মাসে ২বার রোলিং করতে পারেন। বুঝিয়ে বলি আপনি এমনভাবে পণ্য কিনলেন যাতে ২ সপ্তাহে পণ্য বিক্রি হয়ে যায়। তাহলে প্রতি মাসে আপনার লাভ হবে ২০% । মাসে ২০ শতাংশ হলে বছরে ২৪০% । এখন আপনার ৫ লক্ষ টাকার পণ্যে বছর শেষে ১২ লাখ টাকা লাভ হলো। এটা কিন্তু পুরোটা আপনার লাভ নয়। বার্ষিক খরচ রয়েছে, রয়েছে পুঁজি।

১১. বেচতে নয় কিনতে লাভ
ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে একটি কথা প্রচলিত আছে- ব্যবসায়ে নাকি বিক্রি করার সময় লাভ করা যায়না, লাভ করতে হয় ক্রয় করার সময় ।  আসলে তাই:  কারণ একটি পণ্যের মার্কেটে একটি প্রচলিত বা অনাকাংখিত দাম রয়েছে,  আপনি যদি সে দামের চেয়ে বেশী বিক্রি করতে চান, সেটা বিক্রি হবেনা। আর বিক্রি না হলে লাভের প্রশ্ন আসছে না। তাই আপনাকে চেষ্টা করতে হবে আপনার প্রতিদ্বন্ধির চেয়ে কম দামে কিনতে। আপনি যদি ইউনিট প্রতি ১০ টাকা কমদামে ক্যালকুলেটর কেনেন। আপনি মার্কেট প্রাইসে বিক্রি করতে গেলে আপনার প্রতিটিতে ১০ টাকা বেশী লাভ হবে। অথবা আপনি যদি বিক্রি করার সময় ১০টা কমদামে বিক্রি করেন আপনার কোন ক্ষতি হবেনা। বরং কম দামের কারণে আপনার বিক্রি আরেকটু বাড়তে পারে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular