Homeঅন্যান্যআমার খরচাপাতি: হেঁটে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ ভ্রমন

আমার খরচাপাতি: হেঁটে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ ভ্রমন

জাহাঙ্গীর আলম শোভন // ৪৬ দিন ধরে বাংলাদেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত হেঁটেছি। কি পরিমাণ খরচ হয়েছে? অনেকে জানতে চেয়েছেন। অনেকে আবার জানতে না চেয়ে নিজেরাই ধারণা করেছেন। এই ধারণাকারী লোকগুলো তিন রকমের। কারো ধারণা ওরে বাবা এটাতো মেলা টাকা দরকার। আবার কারো ধারণা এ আর এমন কি খরচ? কিছু লোক আছে তারা সঠিক ধারনাটাই করতে পারেন। আসলে সব সময় এমন কিছু লোক থাকে বটে। আমার বক্তব্য হলো এই তিন শ্রেনীর লোকের ধারণাই সঠিক সেটা কিভাবে তা বলার আগে গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ বা ২৯ মার্চ পর্যন্ত আমার কি ধরনের খরচ কিভাবে কত হলো তার একটা ফিরিস্তি ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা যাক।

প্রস্তুতি মূলক খরচ:
প্রপোজাল তৈরি কম্পোজ অনুবাদ এগুলোর পেছনে আমার কেবল সময় ও কয়েকজনের সহযোগিতা গিয়েছে। কিন্তু প্রায় গড়ে ৩০ পৃষ্ঠা করে প্রিন্ট দিয়ে প্রায় ২০ কোম্পানীতে পাঠানো।  বিপিসিতে আমি মোট ৭দিন গিয়েছে। বিটিবিতে গিয়েছি ৩ দিন। বিটিপিতে গিয়েছে চারদিন। কোথাও কোথাও কাগজপত্র একাধিক বার জমা দিতে হয়েছে। স্পন্সর ও পার্টনার এর অফিসে একাধিক বার যেতে হয়েছে যদিও সেটা সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিলো। অবশ্য অনেকের অফিসে যাওয়া লাগেনি। বাংলামেইল অফিসে একবার গেলেও ইত্তেফাক ও রেডিও ফূর্তিতে ২ বার করে যেতে হয়েছে।

আমার স্ট্রলারটার দাম ছিলো আট হাজার টাকা। প্রথমে দুইজোড়া জুতা প্রায় পাঁচ হাজার টাকা, মোজা, ট্রাউজার, হেলমেট, হেলমেটের লাইট, মাল্টিপ্লাগ, রাউটার, কিছু চার্জার, ইউএসবি ক্যাবল ইত্যাদি সব মিলিয়ে প্রায় বিশ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। টি শার্ট কিনলে ডট কম থেকে পাওয়া গেছে, কিন্তু ট্রাউজার কিনতে হয়েছে। তবুও এইসব মিলিয়ে প্রায় ১৫ হাজার টাকার বেশী খরচ হয়ে গিয়েছিলো। আমার মনে আছে ১৫ হাজার টাকা হাতে ধরে কেনাকাটা করার পর কোনো অবশিষ্ট ছিলো না।

অবশ্য সেলফি স্টিক, ডিএসএলআর ক্যামেরা, পাওয়ার ব্যাংক, ট্রাকিং ডিভাইস, স্টেপ কাউন্টার, ল্যাপটপ এসব কিনতে হয়নি বলে কিছু টাকা সেভ হয়েছে। ইভেন্টের স্পন্সর ছিলো www.tour.com.bd, আর অন্য পার্টনারদের মধ্যে ক্যাপ, ডিএসএলআর ক্যামেরা, পাওয়ার ব্যাংক ও ট্রাকিং ডিভাইস www.dinratri.com, স্টেপ কাউন্টার ইউনিকো সল্যুশন, ফটোগ্রাফী ফোকাস ফ্রেম, ওয়ার ওয়ালেটমিক্স, সেলফি স্টিক ডিজিটাল সময়, রাউটার ইকমভয়েস এর সৌজন্যে ছিলো।

এছাড়া কিছু ঔষধ, মাস্ক, সানস্ক্রিণ, ফেস ওয়াশ মলম অন্যান্য জিনিসে হাজার তিনেক টাকা খরচ হয়ে থাকবে। ফেসওয়াশ আর সান ক্রিমগুলো বেশ দামীই ছিলো। আর মেডিক্যাল চেকআপ ও কিছু ঔষধ সৌজন্যে পেয়েছিলাম বটে।

সফরের খরচ থাকা:

তেঁতুলিয়া থেকে হেঁটে টেকনাফ গেলাম ৪৬ দিনে। পরের দিন গেলাম সেন্টমার্টিনে এই হলো ৪৭ দিন। একদিন সেন্টমার্টিন একদিন কক্সবাজার দুইদিন চট্টগ্রাম ছিলাম। এই হলো ৫০ দিন। আমরা কিন্তু ১০ তারিখে ঢাকা ত্যাগ করেছি ১১ তারিখে গিয়ে পৌছাই তেঁতুলিয়া ৫১ দিন ।

Hotel-Haque-tower-in-chittagong
চট্টগ্রামের পর কক্সবাজারের পথে হোটেল হক টাওয়ার ইন যেখানে এক রাতের অতিথি ছিলাম।

পঞ্চাশ দিনের মধ্যে চারদিন কারো না কারো অতিথি হয়েছিলাম, ২ দিন সরকারী বাংলো বিনা খরচায়, পাঁচদিন বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন এর মোটেলে সৌজন্যে ছিলাম। আর চারদিন সরকারী অতিথি শালায় মোট ১১ দিন হোটেলে থাকিনি। কিন্তু তাই বলে খরচ বেঁচে গিয়েছে তা কিন্তু নয়। যখনি কারো বাসায় ছিলাম দুই একদিন বাদে অন্যসময় প্রায় ৫ থেকে ৬শ টাকার ফ্রুটস নিতে হয়েছে আর সরকারী মোটেলে গড়ে ১শ ২শ টাকা করে বখশিশ দিতে হয়েছে। সুতরাং প্রকৃত অর্থে ফ্রি বলতে কিছু ছিল না। এই ১১ দিনেও কম করে হলে ৩ হাজার টাকা থাকা বাবদ খরচ হয়েছে।

হোটেল খরচের মধ্যে সর্বোচ্চ রুম ভাড়া দিয়েছি ৩৫০০ টাকা। সর্বনিম্ন ১৩০ টাকা এটা ফেনী সার্কিট হাউসে। এখানে ভাড়া দিলেও এখানে কিন্তু শুধু দুপুরে রেস্ট দিয়েছি। একদিন একটা হোটেল ভাড়া ছিলো ২৫০ টাকা। এছাড়া বেশীর ভাগ ছিলো ৫শ ৬শ টাকা থেকে উপরের দিকে। কয়েকটা রুমভাড়া ছিলো ১২শ ১৫শ দুই হাজার টাকা করে। একদিন দিন কি দুইদিন বাদে আমাকে প্রতিদিনই ডাবল রুম নিয়ে থাকতে হয়েছে। কোথাও দেখা গেছে সিঙ্গেল রুমেই নেই। কোথাও আবার খালি নেই। কোথাও সিঙ্গেল রুম থাকলেও রুমের যে সাইজ তাতে আমার মালপত্র নিয়ে থাকা সম্ভব নয়। হয়তো চেয়ার টেবিল নেই নয়তো রুমে খালি জায়গাই নেই। কারণ সব জায়গায় আমি আমার স্ট্রলার রুমের মধ্যে নিয়ে গেছি। কারণ আমার ডিভাইস চার্জ দেয়া থেকে শুরু করে যেকোনো কাজে এটা আমার দরকার হয়। এর ফলে ৩শ ৪শ ৫শ টাকায় মফস্বল বা জেলা পর্যায়ে ছোট সিঙ্গেল রুম পাওয়া গেলেও আমাকে তার বদলে ৬শ ৭শ ৮শ হাজার বারোশ টাকা দিয়ে ডাবল রুম নিতে হয়েছে। এবং অন্তত ৫দিন আমাকে শুধু দুপুর বেলার জন্য দুইঘন্টা রেস্ট জন্য একটা রুম ভাড়া নিতে হয়েছে। হয়তো একটু রেস্ট নিয়েছি বা একটু গোসল করেছি। কিন্তু ভাড়াতো সমান, মানে একরাতের ভাড়া ফলে আমার ৪০ দিনের হোটেল খরচ এসেছে ৪২ হাজার টাকার বেশী। প্রাইভেট হোটেলেও বখশিশ দিতে হয়েছে সেটাসহ ৪৬ হাজার টাকার বেশী হবে রেসিডেন্স কস্ট। আসলে ৫০ টাকার কম কাউকে বখশিশ দিতে পারিনি। ২ জনকে দিলে ১০০টাকা। কারণ সব জায়গায় আবাসিক হোটেল গুলো হলো তিনতলায় বা চার তলায় তো সেখানে হোটেল বয়রা ধরাধরি করে আমার ট্রলিটা উঠাতো আবার নামাতো সুতরাং একজনকে পঞ্চাশ টাকার কম দেয়াটা ভালো দেখাতো না।

খাবার দাবার:
সকালে আমার নাস্তাটা ২ বার হয়ে যেতো ৬টা বা ৭টায় একবার আর ৮টা বা ৯টায় একবার। উত্তরে এর খরচ ২৫ থেকে ৪০ টাকা আসতো মাঝে মধ্যে ৭০ বা ৮০ টাকা হতো। দুইবারে কখনো ১শ টাকা ছাড়িয়ে যেতো। পরে ৪০ থেকে ৬০ টাকা এবং মাঝে মধ্যে ১২০ বা তার বেশী মানে দুই বারে দেড়শ টাকা ছাড়িয়ে যেতো। এগারোটা দিকে নাস্তা এটা হালকাই হতো ৩০ থেকে ৫০ এর মধ্যে কখনো বা আরো কম। দুপুরের খাবার উত্তরে ৬০ থেকে একশ আর এদিকটায় ৮০ থেকে ২৫০ পর্যন্ত। বিকেলের নাস্তা ৪টায় একবার ৬টায় একবার। চারটায় ২০ থেকে ৩০ টাকা ৬টায় ৩০ থেকে ৫০টাকা। রাতের খাবার একটু ভালোই খরচ হতো ৫০ থেকে দেড়শ টাকা হয়ে থাকবে। ৫০ টাকা খুব কম দিনেই হয়েছিলো কখনো ১৫০ টাকা এমনকি ২০০ টাকার বেশী হয়ে থাকবে। মানে রেগুলার খাবারে গড়ে দৈনিক ৪০০ টাকা পড়ে যেত।

breakfast
মাঝে মধ্যে এরকম ভালো নাস্তা জুটেছিলো সকালবেলায়

আর ৫-১০ লিটার পানি, বেশীরভাগ দিনে ২টা ডাব খেয়েছি। কখনো দুধ বা খেজুরের রস। অন্তত ২০০ টাকার পানীয়। আধা কেজি কমলা ছিলও আমার রেগুলার ফল। কারণ ভিটামিন সি এর অভাব পূরণের জন্য তা প্রয়োজন। এছাড়া কখনো আঙুর কখনো বেদানা কখনো আপেল, তরমুজ ইত্যাদি নানা ফল খেয়েছি। গড়ে দৈনিক ১৫০ টাকার বেশী ছাড়া কম হবে না।

আসলে আমি খাবার দাবারের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র অলসতা করিনি। কিপটেমিরতো প্রশ্নই উঠে না। ফলে স্বাস্থ্য, সুস্থতা ফিটনেস এবং মনোবল অটুট ছিলো আমার। অবশ্য ১২ কেজী ওজন কমেছে, ৮১ থেকে ৬৯, গড়ে দৈনিক ২৫০ গ্রাম। যদিও আমাকে দেখে সেটা খুব একটা বোঝা যায়নি। কিন্তু আমিতো শুধু ওজন মেপেই টের পাইনি বরং জামা কাপড় ঢিলেঢালা হয়ে যাওয়াতে বেশ ঝামেলায় পড়তে হয়েছে। প্রায় ৭শ টাকার খাবার খরচ ৯শ টাকা হোটেল খরচ। মোট হিসেব করলে দাড়াবে ১৬শ টাকা করে ৫০ দিন মানে ৮০ হাজার টাকা। এছাড়া ১০ হাজার টাকার মতো আমি পথে পথে গরীব দু:খী মানুষকে বিলি করেছি।

আর আমার দুই সঙ্গী যারা আমাকে তেঁতুলিয়া, ঢাকা, কুমিল্লা এবং টেকনাফে সঙ্গ দিয়েছেন। বলাবাহুল্য তারা তাদের পকেটের অনেক টাকা খরচ করেছেন। তবুও যাতায়াত বাদ দিলে আমার সাথে ৬ দিন থাকা খাওয়া বাবদ ২ জনের জন্য গড়ে দিনপ্রতি ১ হাজার টাকা হলে আসে ১২ হাজার টাকা। শেষে ৪ দিন আমার স্ত্রীসহ পরিবারের চার সদস্য ৫ দিন আমার সাথে অবস্থান করে।টেকনাফ একদিন সেন্টমার্টিন ২ দিন কক্সবাজার একদিন এবং চট্টগ্রাম একদিন। এতে প্রায় বাড়তি বিশ হাজার টাকা খরচ হয়। জনপ্রতি দৈনিক খাওয়া থাকা ঘোরা ১০০০ টাকা ধরলাম। হয়তো আরেকটু বেশীও হতে পারে। তবে কৃচ্ছতাসাধন, দরদাম করে খাওয়া, বাড়তি খরচ না করা, দুরে কোথাও না যাওয়া, ২ রুমে ৮ জন থাকা এভাবেই বেশ সেভ করেছিলাম, নইলে সমস্যা হতো, কারণ শেষে টাকা পয়সার বেশ টানাটানি চলছিলো। একেতো ৪০ দিনের সফর ৪৭ দিন হলো তার উপর কক্সবাজার টেকনাফ আর সেন্টমার্টিন এ সবকিছুর দামও বেশী। ১৬ জন শুভাকাংখী যারা এই সফরে বিভিন্নভাবে পাশে ছিলেন তাদের জন্য আচার ও শুটকি অর্ডার করে অনলাইনে পাঠানো হয়েছে। এর বাজেট পাক্কা ১০ হাজার টাকা।

আসুন খরচটা সামারাইজ করি:

প্রস্তুতিমুলক খরচ : ২০,০০০ টাকা (এখানে অনেক কিছুই পার্টনারগণ দিয়েছেন)
থাকা ৫০ দিন : ৪৫,০০০ টাকা (সব মিলিয়ে)
খাওয়া ৫০ দিন : ৩৫,০০০ টাকা (মাঝেমধ্যে কিছু মানুষের অতিথি হয়েছিলাম বটে)
চ্যারিটি ও গিফট: ২০,০০০ টাকা (১০,০০০ টাকা পথে পথে সাহায্য, ১০,০০০ টাকা গিফট)
সঙ্গীদের খরচ: ৩০, ০০০ টাকা (সহযোগীদের জন্য ১০,০০০, ফ্যামিলি মেম্বারদের জন্য ৩০,০০০)
সরাসরি খরচ মোট: ১ লক্ষ ৫০ হাজার। এছাড়া আমি নিজে ৫ মাসের মতো বেকার ছিলাম এর প্রস্তুতি ১ মাস, সফর ২ মাস, সফর পরবর্তী আরো ২ মাস। আমার মোট খরচ তাহলে ৩ লক্ষ টাকা।

যখন সফর শেষ করি তখন কেনাকাটা করার মতো কোনো অর্থ ছিলো না। এমনকি আমার বাবুর জন্যও কিছু কিনতে পারিনি।

আমাদের গ্রামের বাড়ীতে একটা মেলা হয়। নলদিয়া মেলা। আমরা যখন ছোট ছিলাম দেখতাম আমাদের বাপ চাচা মিলে মেলার সবচে বড়ো মাছটা কিনে আনতো। রিকশা ভ্যানে পাটের চট বা প্লাস্টিক বিছিয়ে শুইয়ে আনতো। কয়েক বছর ধরে এটা আমাদের রেওয়াজ হয়ে গিয়েছিলো, বিগত ২০ বছর ধরে আর এমনটা হয়নি, বিশেষ করে ১৯৯১ সাল থেকে যেবার মেলায় দুধুর্ষ ডাকাতি হয়েছিলো।

যাই হোক সফর থেকে ফিরে আসার পর বাবা বলল, ভেবেছি তোমরা কক্সবাজার থেকে বড় একটা শুটকি আনবে। জীবনে বড় বড় মাছ খেয়েছি শুটকি কিন্তু খাওয়া হয়নি। তখন খুব খারাপ লেগেছিলো। আশা করি পরে যখনই কক্সবাজার যাবো সেখানকার সবচে বড় শুটকিটা নিয়ে আসবো। এবারে যে আনতে মন চায়নি তা নয়। কিন্তু ততক্ষণে শুধু কোনো রকমে বাসায় ফেরার ভাড়াটাই ছিলো।

ecomvoice-meadia-partner-deshdekhaএজন্য বলছি, কত খরচ হবে তা নির্ভর করছে আপনার নিজের উপর। আশা করি সকলে একটা ধারণা পেলেন। এই সফর ৫০ হাজার টাকাতেও করা যায় আবার এক লাখ ৫০ হাজার টাকাও খরচ করা যায়।  খরচের থাত দেখে আপনি হিসেব করুন এরকম একটা সফরে আপনার কত পড়বে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular